আলো থেকে হঠাৎ অন্ধকারে এলে চোখ ধাঁধায় কেন?
মানুষের দৃষ্টিশক্তির বৈশিষ্ট্য হলো তার অসাধারণ দক্ষতা। সে তীব্র আলোতে যেমন দেখতে পারে, তেমনি আবার প্রায় অন্ধকারেও দেখতে পারে। যেসব ক্যামেরা দিনের আলোয় ভালো কাজ করে সেগুলো অন্ধকারে প্রায় অকেজো। আবার কম আলোতে ভালো কাজ করে যেসব ক্যামেরা, সেগুলো প্রবল আলোতে ভালো কাজ দেয় না।

মানুষের চোখ কিন্তু আলো-অন্ধকার নির্বিশেষে কাজ করে। তবে আলো থেকে হঠাৎ অন্ধকারে গেলে প্রথমে কিছুই দেখা যায় না। মনে হয় চোখ বুঝি একেবারে অন্ধ হয়ে গেল। কয়েক মিনিট পর ধীরে ধীরে সব দৃশ্যমান হয়। চোখ আলো অনুভব করে ‘রড’ ও ‘কোন’ নামক দু’ধরনের সেল বা অণুর সাহায্যে। কোনো সেল তীব্র আলোয় রঙের অস্তিত্ব ধরতে পারে আর রড সেল স্বল্প আলোয় সাদা-কালো দৃশ্য দেখতে পায়। তাছাড়া রড সেলে রডপসিন নামক এক ধরনের রাসায়নিক পদার্থ থাকে, যা ফোটন শুষে নিয়ে আলোর অস্তিত্ব উপলব্ধি করে। রডপসিন অণু যখন ফোটন অণু শোষণ করে তখন সে রেটিনাল ও অপসিন অণুতে বিভক্ত হয়ে যায়। এ দুটি বিভক্ত অণু পরে আবার বেশ ধীরগতিতে সম্মিলিত হয়ে রডপসিন অণুতে পরিণত হয়। তাই যখন আমরা তীব্র আলোতে দেখি তখন সবগুলো রডপসিন রেটিনাল ও অপসিনে বিভক্ত হয়ে যায়। এ অবস্থায় যদি আমরা কোনো অন্ধকার ঘরে ঢুকি তাহলে প্রথমে চোখে কিছুই দেখা যায় না, কারণ যথেষ্ট আলো না থাকলে কোন দেখতে পারে না, আর রডে কোনো রডপসিন থাকে না বলে রডও অকার্যকর। তবে ধীরে ধীরে রেটিনাল ওঅপসিনে বিভক্ত অণুগুলো সম্মিলিত হয়ে আবার রডপসিনে পরিণত হতে থাকে এবং তখন আবার অন্ধকারেও দেখা সম্ভব হয়। এ জনই অন্ধকারে অভ্যন্ত হতে চোখের কয়েক মিনিট সময় লাগে।
নাইট ভিশন গগল্স কীভাবে কাজ করে?

সম্প্রতি ইরাক যুদ্ধে নাইট ভিশন গগল্স ব্যবহারের কথা বেশ আলাচিত হয়েছে। এটা এমন এক বিশেষ ধরনের চশমা, যা চেখে পরলে অমাবস্যার ঘুটঘুটে অন্ধকারেও অন্তত দু’শ গজ দূরের কোনো মানুষকে অনায়াসে দেখা যায়। আমরা যে অন্ধকারে খালি চোখে কিছু দেখি না তার কারণ হলো কোনো জিনিস দেখার জন্য আবশ্যকীয় শর্তটি সেখানে অনুপস্থিত। শর্তটি হলো আলো। কোনো জিনিসে আলো প্রতিফলিত হয়ে আমাদের চোখে এসে পৌঁছালে তবেই আমরা সে জিনিসটি দেখি। নাইট ভিশন গগলস প্রধানত অন্ধকারেও ছিটেফোটা যেটুকু আলো থাকে, যা খালি চোখে দেখতে পারে না, তাকে বহুগুণ বর্ধিত করে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তোলে। একে বলে ইমেজ এনহ্যান্সমেন্ট (ছবি বর্ধিতকরণ) প্রযুক্তি। নাইট ভিশনের আর একটি প্রযুক্তি হলো থার্মাল ইমেজিং বা তাপ চিত্রায়ন। এ ক্ষেত্রে কোনো বস্তু থেকে নির্গত তাপ বহুগুণ বর্ধিত করে তাকে দৃষ্টিগ্রাহ্য করে তোলা হয়। আমরা সব আলো চোখে দেখি না। যেসব আলোর তরঙ্গ দৈর্ঘ্য একটি নির্দিষ্ট পরিসীমার মধ্যে রয়েছে, খুব বেশি বা কম নয়, সে আলোই আমরা দেখি। তরঙ্গ দৈর্ঘ্য অনুযায়ী সজ্জিত বেগুনি, নীল, আসমানি প্রভৃতি দৃশ্যমান আলোর এক প্রান্তে রয়েছে লাল আলো। এর পরেই অবস্থিত ইনফ্রা রেড স্পেকট্রাম, যা চোখে দেখা যায় না। নাইট ভিশন গগল্স কোনো বস্তুতে প্রতিফলিত এই ইনফ্রারেড আলো ও অন্ধকারের মধ্যে বিরাজমান আবছা আলো সংগ্রহ করে তাকে বিশেষ প্রক্রিয়ায় এমনভাবে রূপান্তর করে, যা ওই বস্তুকে চোখের দৃশ্যমান করে তোলে।
সৈনিকের পোশাক বিচিত্র বর্ণের ও ডোরাকাটা হয় কেন?

এর উত্তর খুব সহজ এবং সবারই জানা। ক্যামোফ্লজ বা ছদ্মবেশ ধারণের মাধ্যমে শত্রুর চোখে ধুলো দেওয়ার উদ্দেশ্যেই সৈনিকরা চক্রবক্র পোশাক ধারণ করে। কিন্তু এ পোশাক কীভাবে শত্রুকে প্রতারণা করে সেটাই আসল প্রশ্ন। সাধারণত পোশাকে জলপাই-সবুজ এবং ধূসর রঙের ডোরা বা ছোপ ছোপ দাগ থাকে। মুখে কালো রঙের ডোরাকাটা দাগ আাঁকা হয়। ট্যাঙ্কগুলোতেও অনুরূপভাবে রংচং দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য একই। শত্রুকে ফাঁকি দেওয়া। ডোরাকাটা বা ছোপ ছোপ দাগসম্পন্ন বস্তুর দিকে তাকালে তার সামগ্রিক রূপটা চোখে পড়ে না, কিছু খণ্ড খণ্ড চিত্র চোখে পড়ে। মানুষ যখন কোনো বস্তুকে পর্যবেক্ষণ করে তখন সে তার চোখের মাধ্যমে সেই বস্তু সম্পর্কে প্রচুর তথ্য সংগ্রহ করে। পরে কখনো সেই বস্তুকে দেখলে মস্তিষ্ক পূর্বের তথ্যগুলো সংযোজনের মাধ্যমে তাকে চিনতে পারে। ডোরাকাটা বা ছোপ ছোপ দাগবিশিষ্ট পোশাকের প্রধান কাজ হলো মানুষের শারীরিক গঠনকে সবুজ ও ধূসর বর্ণের একটি ভিন্ন প্যাটার্নে বিভক্ত রূপে দৃশ্যমান করা। এই প্যাটার্নটি মানুষরূপে চিনতে পারা মস্তিষ্কের পক্ষে কঠিন। কারণ, তার অভিজ্ঞতা বলে যে সবুজ ও ধূসর বর্ণের মিশ্র অবয়বটি মানুষের নয়, গাছের। এভাবে শত্রুর চোখকে ফাঁকি দেওয়া যায়। ফাঁকি দেওয়ার আরো উন্নত পদ্ধতি আবিষ্কৃত হচ্ছে। যেমন, স্মার্ট ক্যামোফ্লাজ। এটি এমন একটি চমৎকার ব্যবস্থা, যার মাধ্যমে একটি কম্পিউটার পাশিপার্শ্বিক পরিবেশ বিশ্লেষণ করে সে অনুযায়ী ক্যামোফ্লাজের জন্য ব্যবহৃত আবরণের রঙ ও ডিজাইন পরিবর্তন করে। এ ক্ষেত্রেও ফর্মুলা সেই একই। শত্রুপক্ষের দৃষ্টিকে বিভ্রান্ত করা। তবে আজকাল থার্মাল ইমেজিং বা অন্যান্য অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে এসব ক্যামোফ্লাজ ধরে ফেলা সম্ভব।
পৃথিবীতে এত পানি এল কোথা থেকে?

পৃথিবীর চার ভাগের তিন ভাগ পানি আর মাত্র এক ভাগ মাটি। মহাসাগর-সাগর-হ্রদ-নদী জুড়ে রয়েছে পানির বিশাল ভাণ্ডার। এত পানি কোথা তেকে এল? পৃথিবীর রুপান্তরের ধারাবাহিকতা লক্ষ করলে এই পানির রহস্য বোঝা যাবে। একসময় এই পৃথিবী আজকের মতো ঋতুবৈচিত্র্য ভরপুর শান্তির নীড় ছিল না। পৃথিবী ছিল একটি উত্তপ্ত গোলকপিণ্ড। পরে এটা ধেিল ধীরে ঠাণ্ডা ও ঘনীভূত হতে থাকে। বিভিন্ন ধাতুর গলিত উত্তপ্ত তরলের মধ্যে একটি বড় অংশ ছিল পানি। এই গলিত তরল যত ঠাণ্ডা হয়ে পৃথিবীর কঠিন উপরিতল গঠিত হতে শুরু করে, ততই সেই গলিত তরলের পানির উপাদান বাষ্প আকারে পৃথিবীর বাইরে ছড়িয়ে পড়তে তাকে। পানির বাষ্পের সঙ্গে বিভিন্ন খনিজ লবণের বাষ্পও বেরিয়ে আসে। কিন্তু পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি এত বেশি যে, এর আকর্ষণ উপেক্ষা করে সেই বাষ্প মহাকাশে বিলীন হয়ে যেতে পারেনি। এই বাষ্প ক্রমান্বয়ে তাপ হারিয়ে এবঙ বায়ুমণ্ডলের চাপে পানিতে পরিণত হয়। পৃথিবীপৃষ্ঠের যেসব অঞ্চল নিচু গহবর ছিল সেগুলো এই পানিতে ভরে মহাসাগরের জন্ম দেয়। সে জন্যই পৃথিবীতে এত বেশি পানি।
